বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ১১:০৬ পূর্বাহ্ন

এমপি কমল ও মেয়র মজিবুর রহমানের ব্যানার টাঙ্গিয়ে রাতারাতি মুজিবনগরে পরিনিত’!

মোহাম্মদ সোহেল আরমান
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২১
  • ১২৩ বার পঠিত

কক্সবাজার প্রতিনিধিঃ কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ইউনিয়নের তৈতৈয়া রফিকের ঘোনা এলাকায় বিচারক, আইনজীবী ও আওয়ামী লীগ নেতাসহ পাঁচটি পরিবারের দুই একরের বেশি কৃষিজমি জোরপূর্বক দখল করে ফেলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয়ণ প্রকল্পের নামে রোহিঙ্গা বসতি স্টাইলে অর্ধশতাধিক ঘরও নির্মাণ করে ফেলেছেন দখলদাররা। পাশাপাশি ওই এলাকার পূর্বের নাম রফিকের ঘোনা পাল্টে রাতারাতি ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, কক্সবাজার-রামুর তিন আসনের সাংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে নাকি উক্ত জমি দখল করেছেন খুরুশকুল ইউনিয়নের ইউপি সদস্য শেখ কামাল ও তার ভাই কামাল উদ্দিন এবং হাজী কামাল। এছাড়া জমি দখল করতে উসকানি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজার সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নু-এমং মারমা মং এর বিরুদ্ধে।

জোরপূর্বক যে জমি জবরদখল করা হয়েছে সেটির মালিক হলেন, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বৃটিশ ভারতের ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ফৌজ আর্মির সদস্য মৃত আবুল হোসেন। তিনি খুরুশকুলের তৈতৈয়া এলাকার বাসিন্দা। বর্তমানে উত্তরাধিকার সূত্রে চট্টগ্রাম আদালতে কর্মরত সিনিয়র সহকারী জজ কামাল উদ্দিন, হাইকোর্টের আইনজীবী বোরহান উদ্দীন রব্বানীসহ পাঁচজন ব্যক্তির পরিবার এসব কৃষিজমির মালিক।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানায়, ব্রিটিশ আমল থেকে খুরুশকুল-মৌজার বি.এস ৩৯৮নং খতিয়ানের বি.এস ৪৪৬৬ দাগের ৩.৪৪ একর জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন তারা। কিন্তু গত ১১ এপ্রিল গভীর রাতে কোন কারণ ছাড়াই এমপি কমলের নাম ভাঙিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য শেখ কামাল ও তার বড় ভাই কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী সবজি ক্ষেত উপড়ে ফেলে দুই একরের বেশি জায়গা দখল করে ঘর নির্মাণ শুরু করে। বিষয়টি ভুক্তভোগীরা প্রশাসনকে অবগত করেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিচারক কামাল উদ্দিনের বাবা ও খুরুশকুল ১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি মো. রফিক অভিযোগ করে বলেন, ‘সদর এসি-ল্যান্ডের উসকানিতে এমপি সাইমুম সরওয়ার কমলের নাম ভাঙিয়ে তাদের কৃষিজমি দখল করেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা।’ একই অভিযোগ আইনজীবী বোরহান উদ্দীনসহ ভুক্তভোগী অন্যান্যদের।

সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, এরইমধ্যে দখলদার চক্রটি কৃষিজমির সবজি ক্ষেত নষ্ট করে সেখানে ২৭টি ঘর নির্মাণ করেছে। আরও প্রায় ২৫টি ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখার আশায় প্রায় প্রতিটি ঘরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সজিব ওয়াজেদ জয়ের ছবির পাশাপাশি স্থানীয় সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান এবং উদ্যোক্তা হিসেবে অভিযুক্ত কামাল উদ্দীনের ছবিযুক্ত ব্যানার টাঙানো হয়েছে।

এ সময় সংবাদকর্মীদের উপস্থিতির খবর পেয়ে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য শেখ কামাল দলবলসহ সেখানে উপস্থিত হন। তিনি বলেন, ‘জায়গাটি ব্রিটিশ আমল থেকেই রফিকুল ইসলামের পরিবার ভোগদখল করে আসছে। আমরা এতদিন জানতাম জায়গাটি ‘জোত জায়গা’। কিন্তু সদর এসিল্যান্ড এটি খাসজমি বলে আমাদের নিশ্চিত করেছেন। এ কারণে এ জমিতে স্থানীয় গৃহহীনদের ঘর করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে যারা ঘর নির্মাণ করেছেন তাদের কারোরই ঘর নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা না বলা পর্যন্ত তারা কেউ দখল ছেড়ে যাবে না। আর যদি রেজিস্ট্রি জায়গা প্রমাণ হয় তবেই সবাইকে আবার উচ্ছেদ করা হবে।’

সরকারি জমিতে দলবল নিয়ে অবৈধভাবে দখল করে ঘর নির্মাণ করা যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে কামাল বলেন, ‘গৃহহীনদের দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না।’ তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে একই কথা বলেছেন গৃহহীন দাবি করা ও ঘর নির্মাণ করে সেখানে অবস্থান করা নুরুল আলম, মো. সালামসহ অনেকেই।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দখল করাদের কেউ গৃহহীন নয়। বেশিরভাগ ওই এলাকার বাসিন্দাও নয়। তাদের ভাড়াটিয়া হিসেবে আনা হয়েছে। আবার কেউ কেউ জমি পাওয়ার আশায় টাকা দিয়ে সেখানে ঘর নির্মাণ করেছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্বাস্তু কিছু পরিবারকে কক্সবাজার শহর থেকে নিয়ে এসে খুরুশকুলের তৈতৈয়ায় রফিকের ঘোনা এলাকায় সামাজিক বনায়নের জায়গায় পুনর্বাসন করার কথা ছিল। কিন্তু বনায়নের উপকারভোগীদের পক্ষে মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি সরকারি বনের জমি রক্ষায় হাইকোটে রিট আবেদন করলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন হাইকোট। পিটিশন নং ৪১৭০/২০২১। উচ্চ আদালতের এ নিষেধাজ্ঞার কারণে বনভূমিতে আশ্রয়ণ প্রকল্প আটকে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন স্থানীয় ইউপি শেখ কামাল, তার বড় ভাই কামাল উদ্দীনসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

স্থানীয়দের দাবি, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অনেক পরিবারের কাছ থেকে ৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে ওই চক্রটি। অন্যদিকে আশ্রয়ণ প্রকল্পটি আদালতের নির্দেশে আটকে যাওয়ায় কোন উপায় না পেয়ে বিচারক, আইনজীবীর পরিবারের কৃষিজমি দখলে নিয়েছেন তারা।

জানতে চাইলে কথিত উদ্যোক্তা ও দখলদার হিসেবে অভিযুক্ত কামাল উদ্দীন কামাল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এটি কারও ব্যক্তিগত জায়গা নয়। এসিল্যান্ড বলেছেন,এটি সরকারি জমি। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই ওই জমিতে গৃহহীনদের জন্য ঘর করা হচ্ছে।’ বনভূমিতে আশ্রয়ণ প্রকল্প করার বিষয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এরপরও অন্যের জমি দখল করে আশ্রয়ণ প্রকল্প তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ জন্য যদি জেল-ফাঁসি হয় আমার কোনো আপত্তি নেই।’

স্থানীয় বাসিন্দা মাওলানা নুরুল আবছার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, ১৯৩৮ সাল থেকে ওই জমি মৃত আবুল হোসেনের পরিবার ভোগদখল করে আসছে। কিন্তু গত কয়েকদিন আগে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চিহ্নিত কিছু অপরাধীরা তা দখল করে ঘর নির্মাণ করেছে।’

জানতে চাইলে খুরুশকুল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দীন বলেন, ‘স্থানীয় ইউপি সদস্য শেখ কামাল ও তার বড় ভাই কামালের নেতৃত্বে বিচারক-পরিবারের কৃষিজমি দখল করে ফেলা হয়েছ।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Developed By Jagroto Chattogram
banglawebs999995